তামার বাজারে ঐতিহাসিক আগুন: বিশ্বজুড়ে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম কি তবে হাতের নাগালের বাইরে?ঘরের বৈদ্যুতিক তার, এসি, ফ্রিজ কিংবা হাতের মোবাইল ফোন—সবকিছুতেই যে ধাতুটি নিরবে কাজ করে যায়, তা হলো তামা বা কপার। বিশ্ববাজারে হঠাৎ করেই সেই তামার দাম রূপ নিয়েছে এক বড় উত্তেজনায়। গত চার দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে তামা যেন নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন কেনাকাটায়।
চার দিনের হিসাব ও বর্তমান চিত্র
আন্তর্জাতিক ধাতু বাজার ‘লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ’ (LME)-এর হিসেব বলছে, সেপ্টেম্বর ৩ তারিখে এক মেট্রিক টন তামার দাম যেখানে ছিল ১৪,৩৫৯ ডলার, মাত্র চার দিনের মাথায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,৫৩৩ ডলারে। অর্থাৎ প্রতি টনে দাম বেড়েছে প্রায় ১৭৪ ডলার। বর্তমানের এই দর তামার ইতিহাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে বেশি।
কেন হঠাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে তামার দর এত চড়া?
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে তামার দাম বৃদ্ধির কয়েকটি প্রধান কারণ সামনে আসে:
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি (US Tariff Fears): যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি এড়াতে বিশ্বজুড়ে বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তামা গুদামজাত করে মার্কিন গুদামগুলোতে জমা করতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে পর্যাপ্ত তামার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
প্রযুক্তির উত্থান ও এআই ডেটা সেন্টার: বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বিশেষ করে এআই (Artificial Intelligence) সংক্রান্ত বিশাল বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরিতে তামার ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে।
খনিতে সরবরাহ সংকট: বিশ্বের সবচেয়ে বড় তামা উৎপাদনকারী দেশ চিলি এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্রধান প্রধান খনিগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে যোগানের সংকট বা ‘সাপ্লাই ক্রাঞ্চ’ তৈরি হয়েছে।
এর ফলে কী কী সমস্যা বা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে?
তামার দাম এভাবে আকাশচুম্বী হওয়ার কারণে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে:
ইলেকট্রনিক্স ও বাড়ির তারের দাম বৃদ্ধি: ঘরের ফ্যান, ফ্রিজ, এসি এবং বৈদ্যুতিক তারের (Wires & Cables) উৎপাদনে প্রধান উপাদান হিসেবে তামা ব্যবহৃত হয়। কাঁচামালের দাম বাড়ার ফলে এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সরাসরি বাড়বে।
আবাসন ও নির্মাণ খরচ বৃদ্ধি: নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ কিংবা মেটাল পাইপলাইন বসানোর খরচ বেশ খানিকটা বেড়ে যাবে।
সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ: আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাড়তি ডলার খরচ করে তামা আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক বাজারেই মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির ইতিবাচক দিক বা সুবিধা কী হতে পারে?
বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির বাজার চাপের মধ্যেও এর কয়েকটি আশাব্যঞ্জক দিক রয়েছে:
বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ (Metal Recycling) শিল্পের বিকাশ: নতুন তামার আকাশচুম্বী দামের কারণে পুরনো বা স্ক্র্যাপ তামা রিসাইক্লিংয়ের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে পরিবেশবান্ধব মেটাল রিসাইক্লিং খাত ও ক্ষুদ্র বর্জ্য ব্যবসায়ীদের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে।
