Headlines

ডায়ালাইসিসকে বিদায়: শূকরের কিডনিতে নতুন জীবনের গল্প

ডায়ালাইসিসকে বিদায়: শূকরের কিডনিতে নতুন জীবনের গল্প ডায়ালাইসিসকে বিদায়: শূকরের কিডনিতে নতুন জীবনের গল্প

ডায়ালাইসিসকে বিদায় শূকরের কিডনিতে নতুন জীবনের গল্প। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলক স্পর্শ করেছে ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতাল (MGH)। শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগে (ESRD) আক্রান্ত ৬৬ বছর বয়সী রোগী টিম অ্যান্ড্রুস জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি নিয়ে ২৭১ দিন সফলভাবে বেঁচে থাকার পর, অবশেষে একটি মানব কিডনি গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই ঘটনাটি চিকিৎসা জগতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

​চিকিৎসা বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক অর্জন: ডায়ালাইসিস-মুক্ত জীবন

​চিকিৎসকদের মতে, জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন (প্রাণী থেকে মানুষের দেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপন) ডায়ালাইসিসের বিকল্প হিসেবে এবং মানব অঙ্গ পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ের একটি চমৎকার ‘সেতুবন্ধন’ বা ব্রিজিং থেরাপি হিসেবে কাজ করতে পারে। ল্যানসেট (The Lancet) জার্নালে প্রকাশিত একটি চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণায় এই সাফল্য তুলে ধরা হয়।

​২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্ড্রুজের দেহে বায়োটেকনোলজি কোম্পানি ইজেনেসিস (eGenesis)-এর প্রস্তুতকৃত একটি জিনগতভাবে সম্পাদিত শূকরের কিডনি বসানো হয়। এর আগে কোনো জীবিত মানুষের দেহে জেনোগ্রাফ্ট বা প্রাণীর অঙ্গ এতদিন কার্যকর থাকেনি। দীর্ঘ ৯ মাস তিনি সম্পূর্ণ ডায়ালাইসিস ছাড়াই জীবনযাপন করেন, যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ কিডনি রোগীর জন্য এক আশার আলো।

​প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মাইলফলক ও জটিলতা

​অ্যান্ড্রুজের এই ৯ মাসের যাত্রাপথ চিকিৎসকদের জন্য ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। অস্ত্রোপচারের পরপরই শূকরের কিডনিটি কার্যকর হয় এবং বর্জ্য নিষ্কাশন শুরু করে।

​প্রারম্ভিক সাফল্য: অস্ত্রোপচারের পর শূকরের কোনো রোগজীবাণু মানবদেহে সংক্রমিত হয়নি এবং টি-সেল-জনিত প্রত্যাখ্যানের প্রাথমিক সমস্যাটি চিকিৎসায় দ্রুত সেরে যায়।

​অনাক্রম্যতার চ্যালেঞ্জ: প্রায় ছয় মাস পর, একটি সংক্রমণের কারণে ইমিউনোসাপ্রেসিভ (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমানোর) ওষুধ কমিয়ে দিতে হয়।

​অঙ্গ বিকল ও সমাধান: ওষুধ কমানোর ফলে কিডনিতে প্রদাহ ও মাইক্রোভাসকুলার ক্ষতি দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে অঙ্গটিকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তবে ততদিনে একজন উপযুক্ত মানব দাতার কিডনি পাওয়া গেলে অ্যান্ড্রুজকে সফলভাবে মানব কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।

অগ্রগতি ও সময়রেখা

সময়কালগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা & চিকিৎসাগত প্রভাব

মার্চ ২০২৪বিশ্বের প্রথম জীবিত মানুষের দেহে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন (রোগী ৫২ দিন বেঁচে ছিলেন)।

জানুয়ারি ২০২৫টিম অ্যান্ড্রুজের দেহে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপন।

অক্টোবর ২০২৫ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট কমানোর ফলে কিডনিতে মাইক্রোভাসকুলার ইনজুরি ও প্রদাহ সৃষ্টি।

জানুয়ারি ২০২৬২৭১ দিন পর অ্যান্ড্রুজ সফলভাবে একটি মানব কিডনি গ্রহণ করেন (প্রথম মানব রূপান্তর)।

সেপ্টেম্বর ২০২৬ল্যানসেট জার্নালে গবেষণা প্রকাশ এবং দ্বিতীয় রোগীর জেনোট্রান্সপ্ল্যান্ট থেকে মানব কিডনিতে উত্তরণের ঘোষণা।

চিকিৎসাক্ষেত্রে দূরগামী প্রভাব

​ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের কিডনি প্রতিস্থাপন বিভাগের মেডিকেল ডিরেক্টর ড. লিওনার্দো রিয়েলা জানান, “অঙ্গ সংকটই এই মুহূর্তে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিডনি বিকল হওয়া রোগীদের জন্য জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ডায়ালাইসিসের একটি দীর্ঘমেয়াদী ও নিরাপদ বিকল্প হতে পারে।”

​এই কেস স্টাডিটি প্রমাণ করে যে শূকরের কিডনি শুধু সাময়িক সচল থাকে না, বরং এটি মানবদেহে গুরুতর ইমিউন প্রতিক্রিয়া না ঘটিয়ে দীর্ঘদিন ডায়ালাইসিস বন্ধ রাখতে পারে। তবে এই গবেষণার কিছু গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল দিক ভবিষ্যতে নজর দেওয়ার দাবি রাখে:

​মাইক্রোভাসকুলার প্রতিরোধ: ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ কমানোর সাথে সাথে ক্ষুদ্র রক্তনালীতে যে ক্ষতি (Microvascular injury) দেখা গেছে, তা রোধে ভবিষ্যতে আরও উন্নত ‘জেনেটিক এডিটিং’ প্রয়োজন।

​অ্যান্টিবডি সেনসিটাইজেশন: শূকরের অঙ্গ শরীরে থাকার কারণে মানব কিডনি গ্রহণের সময় কোনো প্রতিক্রিয়া বা অতি-সংবেদনশীলতা তৈরি হয়নি, যা এক বিরাট বায়োলজিক্যাল সাফল্য।

​টিম অ্যান্ড্রুজের এই সফল রূপান্তর কিডনি চিকিৎসায় এক নতুন যুগের সূচনা করল। অঙ্গসংকটের এই যুগে জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ভবিষ্যতে মানব অঙ্গ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জীবন রক্ষায় মূল ভূমিকা পালন করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *