Global24plus

হিমালয়ে মহা-বিপর্যয়ের সংকেত: এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের বর্জ্য ও জ্বালানি যেভাবে বরফ গলাচ্ছে

হিমালয়ে মহা-বিপর্যয়ের সংকেত: এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের বর্জ্য ও জ্বালানি যেভাবে বরফ গলাচ্ছে

হিমালয়ে মহা-বিপর্যয়ের সংকেত: এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের বর্জ্য ও জ্বালানি যেভাবে বরফ গলাচ্ছে

হিমালয়ে মহা-বিপর্যয়ের সংকেত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের বর্জ্য ও জ্বালানি যেভাবে বরফ গলাচ্ছে। পর্বতারোহণ এবং অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের ক্ষেত্রে এভারেস্ট বেস ক্যাম্প এক স্বপ্নের নাম। তবে হিমালয়ের কোল ঘেঁষে তৈরি এই জনপ্রিয় পর্যটন ক্ষেত্রটিই এখন হিমবাহ গলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘রিজিওনাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’ জার্নালে প্রকাশিত নেপালি ও আমেরিকান বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ হিমালয় অঞ্চলে এক আসন্ন পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্প্রতি নেপালে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ উপচে পড়া এবং আকস্মিক বন্যায় ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বহু গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

​হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রধান কারণ ও মূত্রের প্রভাব

​বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বেস ক্যাম্পে পর্বতারোহীদের অবস্থান এবং তাদের দৈনন্দিন বর্জ্য হিমবাহের ওপর প্রত্যক্ষ চাপ সৃষ্টি করছে। পর্বতারোহীরা উচ্চতাজনিত অসুস্থতা এড়াতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পানি পান করেন, যার ফলে মূত্রত্যাগের পরিমাণও বাড়ে।

​দৈনিক মূত্র উৎপাদন: গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর্বতারোহণ মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ৬,৭৬৬ লিটার মূত্র উৎপন্ন হয়েছিল।

​তাপমাত্রার প্রভাব: মানবদেহের মূত্রের তাপমাত্রা সাধারণত ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। যদিও এই তাপের বড় অংশ বাতাস বা আশপাশের পাথরে মিলিয়ে যায়, তবুও একটি ক্ষুদ্র অংশ সরাসরি বরফের সংস্পর্শে আসে।

​বরফ গলার হিসাব: বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, শুধুমাত্র মূত্রের তাপের প্রভাবেই পুরো মৌসুমে প্রায় ১৫৪ টন বরফ গলে গেছে।

​জ্বালানি খরচ ও উন্নত সুবিধার অপ্রত্যক্ষ ক্ষতি

​মূত্রের তাপ একটি কারণ হলেও, পর্বতারোহীদের জন্য নির্মিত আধুনিক বেস ক্যাম্পগুলো বরফ গলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। প্রতি বছর খুম্বু হিমবাহের ওপর প্রায় ১,৬০০টি তাঁবু স্থাপন করা হয়। এসব তাঁবুতে হিটার, জেনারেটর, গরম মেঝের (heated floors) মতো বিলাসবহুল সুবিধা নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হয়।

​গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে বেস ক্যাম্পে ব্যবহৃত প্রধান জ্বালানির পরিমাপ ছিল:

​এলপিজি সিলিন্ডার: ৮২৪টি

​কেরোসিন: ১৮,৯৩৫ লিটার

​গ্যাসোলিন: ৫,১৩০ লিটার

​উৎপন্ন মোট তাপের ৯৪ শতাংশের জন্য সরাসরি এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দায়ী, আর বাকি ৬ শতাংশের জন্য দায়ী পর্বতারোহীদের শারীরিক বর্জ্য বা মূত্র।

​পরিবেশগত প্রভাব

​’সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ (২০১৯)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে হিমালয়ে বরফ গলার হার আগের ২৫ বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। খুম্বু হিমবাহের বেস ক্যাম্প অঞ্চলের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রতি দশকে প্রায় ০.২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বাড়ছে। মানুষের সরাসরি উপস্থিতির কারণে সৃষ্ট এই স্থানীয় উষ্ণায়ন (localized warming) বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

​পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, অনিয়ন্ত্রিত বেস ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা দ্রুত বন্ধ না করলে হিমালয়ের নিম্নাঞ্চলের নদী অববাহিকায় বন্যা ও ধসের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়বে। পরিবেশবিদরা সৌরশক্তির মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি ব্যবহার, বর্জ্য নিষ্কাশনে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ এবং বেস ক্যাম্পটি অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপদ নিচু স্থানে স্থানান্তরের ওপর জোর দিচ্ছেন।

Exit mobile version