ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রতিরক্ষা কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন মাত্রায় পৌঁছাতে চলেছে। ভারতের সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত মার্কিন ‘জ্যাভলিন’ (Javelin) অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সিস্টেম কেনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর (Sergio Gor) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম X-এ পোস্ট করে এই বড় খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয় নয়, বরং দু’দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদনের (Co-production) একটি অভূতপূর্ব দুয়ার উন্মোচন করছে।
১. জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল কী এবং কেন এটি এত বিশেষ?
এফজিএম-১৪৮ জ্যাভলিন (FGM-148 Javelin) হলো বিশ্বের অন্যতম সেরা ম্যান-পোর্টেবল, ‘ফায়ার-এন্ড-ফরগেট’ (Fire-and-Forget) মাঝারি পাল্লার অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল সিস্টেম। অর্থাৎ, এটি একজন সেনা সদস্য একা কাঁধে নিয়ে পরিচালনা করতে পারেন।মিসাইলটি ছোঁড়ার পর অপারেটরকে সেটিকে গাইড করতে হয় না; অটোমেটিক ইনফ্রারেড সেকার নিজেই লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করে আঘাত হানে। এর ফলে মিসাইল ছোঁড়ার সাথে সাথেই সেনা সদস্য নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন।
জ্যাভলিনের প্রধান প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ:
টপ-অ্যাটাক মোড (Top-Attack Mode): ভারী সাঁজোয়া যান বা ট্যাঙ্কের ওপরের অংশ সবচেয়ে দুর্বল থাকে। জ্যাভলিন মিসাইলটি সোজা না গিয়ে একটি ধনুকাকার (Inverted U-shape) পথ অনুসরণ করে ওপর দিক থেকে ট্যাঙ্কের ক্যানোপিতে আঘাত হানে।
সফট-লঞ্চ প্রযুক্তি (Soft-Launch Capability): মিসাইলটি প্রথমে হালকা ধাক্কায় টিউব থেকে বের হয়ে আসে এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে যাওয়ার পর প্রধান রকেট মোটর সক্রিয় হয়। এর ফলে কোনো ভবন বা বাঙ্কারের ভেতর থেকেও এটি নিরাপদে ফায়ার করা সম্ভব।
সহজ বহনযোগ্যতা: সম্পূর্ণ সিস্টেমটির ওজন এবং কমান্ড লঞ্চ ইউনিট (CLU) এতটাই হালকা যে পাহাড়ি ও দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোতে পদাতিক বাহিনীর জন্য এটি অত্যন্ত সুবিধাজনক।
২. ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সম্পর্কে ‘গেম চেঞ্জার’ পদক্ষেপ
ভারত ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। গত বছরের শেষ দিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (US State Department) ভারতের কাছে জ্যাভলিন মিসাইল এবং এক্সক্যালিবার প্রিসিশন-গাইডেড আর্টিলারি ক্রয়ের সম্ভাব্য অনুমোদন দেয়।
এই চুক্তির মাধ্যমে ভারতের অস্ত্রাগারে মার্কিন প্রযুক্তির আরেকটি শক্তিশালী সংযোজন ঘটছে। এর আগে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাপাচি অ্যাটাক অ্যাটাক হেলিকপ্টার, চিনুক, সি-১৭ ও পিসাই ৮-আই (P-8I) মেরিন এয়ারক্রাফটের মতো উন্নত সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে।
৩. বিশেষজ্ঞ স্তরের বিশ্লেষণ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
এই অস্ত্র চুক্তির কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বিশেষজ্ঞরা এটিকে প্রধানত তিনটি দিক থেকে বিশ্লেষণ করছেন:
সীমান্তে প্রতিরোধ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তে যেখানে ভারী সাঁজোয়া যান চালানো কঠিন, সেখানে পদাতিক বাহিনীর হাতে জ্যাভলিনের মতো পোর্টেবল ও দূরপাল্লার মিসাইল থাকা শত্রুর ট্যাঙ্কের জন্য বিশাল হুমকি তৈরি করবে।
যৌথ উৎপাদন (Co-production) ও আত্মনির্ভরতা: মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এই চুক্তি থেকে ভবিষ্যতে ভারতে জ্যাভলিন যৌথ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এটি ভারতের “মেক ইন ইন্ডিয়া” প্রতিরক্ষা উদ্যোগকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে ত্বরান্বিত করবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য: দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে ইন্টারঅপারেবিলিটি (Interoperability) বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি, যা এই চুক্তির মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হবে।
ভারতের জ্যাভলিন মিসাইল কেনার সিদ্ধান্ত কেবল সামরিক সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং নয়া দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার কৌশলগত অটুট বন্ধনের এক স্পষ্ট বার্তা বহন করে।