নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের রেশ এবার আছড়ে পড়ল পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায়। হিমালয়ের তরাই অঞ্চলে আকস্মিক প্লাবনের ফলে সৃষ্ট বিপুল জলরাশি ভারতের দিকে ধেয়ে আসায় ফরাক্কা ব্যারেজে গঙ্গার জলস্তর বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন (CWC) জানিয়েছে, ফরাক্কায় গঙ্গার বিপদসীমা ২২.২৫ মিটার হলেও বর্তমান জলস্তর ২২.৭৭ মিটার ছাড়িয়ে গেছে। উজান থেকে আসা জলের চাপ সামলাতে ব্যারেজের গেট খুলে ডাউনস্ট্রিমে প্রায় সাড়ে ১১ লক্ষ কিউসেক জল প্রবাহিত করা হচ্ছে, যার ফলে মুর্শিদাবাদের ফরাক্কা থেকে শুরু করে সামশেরগঞ্জ, সুতি, লালগোলা, জিয়াগঞ্জ এবং জলঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত নদী তীরবর্তী এলাকায় তীব্র বন্যা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট জেলা ও ব্লক প্রশাসন হাই অ্যালার্ট জারি করেছে। ফরাক্কার নিচু এলাকাগুলিতে এবং গঙ্গার নদীপাড় সংলগ্ন গ্রামগুলিতে মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে এবং সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে। পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের নদীতে যেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফিডার ক্যানাল দিয়েও ৪০ হাজার কিউসেকের বেশি জল ছাড়া হচ্ছে। রাতের মধ্যে জলস্তর আরও বাড়ার পূর্বাভাসের কারণে চরম উদ্বেগে প্রহর গুনছেন নদীতীরের হাজার হাজার গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ।
গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধির মূল কারণ ও বর্তমান চিত্র
নেপালের পার্বত্য অববাহিকায় ভারী বৃষ্টিপাত ও হড়পা বানের ফলে গণ্ডক ও কোশী নদী দিয়ে আসা অতিরিক্ত জল পাটনায় গঙ্গায় এসে মিশছে। রাজমহল হয়ে এই বিপুল জলরাশি ফরাক্কায় পৌঁছানোতেই বিপত্তি দেখা দিয়েছে।
বিপদসীমা: ২২.২৫ মিটার।
বর্তমান জলস্তর: ২২.৭৭ মিটার (বিপদসীমার আধ মিটারেরও বেশি উপরে)।
জল প্রবাহের পরিমাণ: ফরাক্কা ব্যারেজ থেকে ভাটির দিকে প্রতিদিন প্রায় ১১.৫ লক্ষ কিউসেক জল ছাড়া হচ্ছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা: ফরাক্কা, সামশেরগঞ্জ, সুতি, লালগোলা, ধুলিয়ান এবং জলঙ্গী ব্লক।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
এই আকস্মিক প্লাবন কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর পেছনে বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের প্রভাব ও কৌশলগত সংকট লুকিয়ে রয়েছে:
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং মেগাবৃষ্টির (Cloudburst) ঘটনা গঙ্গার সংলগ্ন অববাহিকা অঞ্চলকে ক্রমাগত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
নদী ভাঙন ও পলি জমার সংকট: গঙ্গায় বিপুল পরিমাণ জল ও পলি আসার ফলে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে জলধারণ ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে খুব দ্রুত তীরবর্তী প্লাবন ও ভয়াবহ নদী ভাঙন দেখা দিচ্ছে, যা মালদা ও মুর্শিদাবাদের নদীপাড়ের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিচ্ছে।
ফরাক্কা চুক্তির জটিলতা: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ১৯৯৬ সালের ফরাক্কা জলবন্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে পূর্ণ হতে চলেছে। ব্যারেজ থেকে হঠাৎ বিপুল জল প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন অববাহিকার বাংলাদেশ অংশেও প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক জলকূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
জরুরি বিপর্যয় মোকাবিলা প্রস্তুতি: প্রশাসনিক স্তরে উদ্ধারকারী টিম প্রস্তুত রাখা হলেও নিচু এলাকার মানুষের দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত না করা গেলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।