দীর্ঘ চার দশকের তীব্র আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আর অর্থনৈতিক অবরোধের পর সিরিয়ার অর্থনীতিতে বইতে শুরু করেছে পরিবর্তনের হাওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশ’-এর তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পরপরই, বৈশ্বিক পেমেন্ট জায়ান্ট ভিসা ও মাস্টারকার্ড সেদেশে তাদের ডিজিটাল কার্ড পরিষেবা এবং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক পুনর্বহাল করেছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্কের এক ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় আন্তর্জাতিক ভিসা কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করে এই নতুন পথচলার সূচনা করেন দেশটির প্রশাসনিক প্রধান। বহু বছর পর সিরিয়ার মাটিতে এটিই ছিল কোনো বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রথম সরাসরি লেনদেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে কেবল আর্থিক খাতের পুনরুদ্ধার নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্জন্মের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
সিবিসি ও বৈশ্বিক পেমেন্ট কাঠামোর সমন্বয়
নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার ফলে সিরিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংক এবং স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অতি দ্রুত বৈশ্বিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হতে সক্ষম হচ্ছে। এই আকস্মিক পদক্ষেপে স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়িক লেনদেন প্রক্রিয়া পুরোপুরি রূপ বদলাতে শুরু করেছে।
মাস্টারকার্ড ও কিউএনবি (QNB) অংশীদারিত্ব: কাতার ন্যাশনাল ব্যাংক (QNB)-এর প্রযুক্তিগত সহায়তায় মাস্টারকার্ড সিরিয়ার হোটেল, শপিং মল এবং প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে পয়েন্ট-অফ-সেল (POS) টার্মিনাল সচল করেছে।
ভিসার সরাসরি পরীক্ষা মূলক লেনদেন: লেবাননভিত্তিক ফ্রান্সাব্যাংক এবং স্থানীয় পেটেক সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ভিসা তাদের ডিজিটাল ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার প্রাথমিক ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
প্রবাসী ও পর্যটকদের স্বস্তি: বহুবছর পর মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকে আসা প্রবাসী সিরীয়, বিনিয়োগকারী এবং পর্যটকরা ক্যাশ টাকা বহনের ঝুঁকি ছাড়াই আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড ব্যবহার করতে পারছেন।
সিরীয় অর্থনীতি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের নতুন সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের কালোতালিকা থেকে সিরিয়ার মুক্তি এবং পরবর্তীতে ভিসা ও মাস্টারকার্ড চালুর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি দূর হলো। এর ফলে কয়েক ডজন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র সরাসরি লাভবান হতে যাচ্ছে:
১. ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: সম্পূর্ণ ক্যাশ বা নগদ অর্থনির্ভর ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্বচ্ছ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করছে দামেস্ক।
২. আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল: বিদেশি আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা এখন সরাসরি ব্যাংক চ্যানেলে লেটার অব ক্রেডিট (LC) খুলতে পারছেন, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে সহায়ক হবে।
৩. পুনর্গঠন প্রকল্পে বেসরকারি মূলধন: সংঘাতজনিত ধ্বংসস্তূপ কাটিয়ে সড়ক, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতের পুনর্গঠনে এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিশ্চিন্তে অর্থায়ন করতে পারছে।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ মতামত
আইনি বাধা দূর হওয়ায় কার্ড পেমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের পথ সুগম হলেও, স্বল্পমেয়াদে সিরিয়ার ব্যাংকগুলোর সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, ভিসা ও মাস্টারকার্ডের এই প্রত্যাবর্তন মূলত দেশটির আর্থিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ মাত্র।
সিরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এখন দ্রুত আন্তর্জাতিক মানের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (AML) এবং কাউন্টার-টেররিজম ফাইন্যান্সিং (CTF) ফ্রেমওয়ার্ক জোরদার করতে হবে। পশ্চিমা কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলো সিরীয় ব্যাংকগুলোর সাথে নমনীয়ভাবে লেনদেন বা করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং চালু করতে তখনই আস্থা পাবে, যখন এসব কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হবে। তবে সামগ্রিক বিচারে, এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় এক অভূতপূর্ব ইতিবাচক বার্তা প্রদান করে।