দীর্ঘ সাড়ে চার দশকের আইনি ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরতে শুরু করেছে সিরিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশ’ (State Sponsor of Terrorism)-এর তালিকা থেকে অপসারণ করার পরপরই, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ভিসা এবং মাস্টারকার্ড সেদেশে তাদের পেমেন্ট নেটওয়ার্ক পুনর্বহাল করেছে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা দামেস্কের একটি রেস্তোরাঁয় আন্তর্জাতিক ভিসা কার্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করে এই নতুন আর্থিক যাত্রার সূচনা করেন। বহু বছর পর সিরিয়ায় এটিই ছিল কোনো বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সরাসরি কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে সিরিয়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
সিবিসি ও গ্লোবাল পেমেন্ট নেটওয়ার্কের প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘদিন ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ফলে সিরিয়ার ব্যাংকিং খাত বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। মার্কিন পদক্ষেপের ফলে এই বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কেটে গেছে।
মাস্টারকার্ড ও কিউএনবি (QNB) চুক্তি: কাতার ন্যাশনাল ব্যাংকের (QNB) সাথে যৌথ উদ্যোগে মাস্টারকার্ড সিরিয়ার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পয়েন্ট-অফ-সেল (POS) টার্মিনালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন চালু করেছে।
ভিসার সরাসরি পরীক্ষা: লেবাননভিত্তিক ফ্রান্সাব্যাংক এবং স্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থা পেমিরা-র সহায়তায় ভিসা তাদের প্রথম লাইভ ট্রানজেকশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
সহজ বৈদেশিক লেনদেন: নতুন ব্যবস্থার ফলে প্রবাসী সিরীয়, আন্তর্জাতিক পর্যটক এবং বিদেশি ব্যবসায়ীরা এখন যেকোনো আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশটিতে লেনদেন করতে পারবেন।
সিরিয়া অর্থনীতি ও বৈশ্বিক কাঠামোর প্রভাব
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত এই ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা সন্ত্রাসবাদের তকমাটি উঠিয়ে নেওয়ায় বৈশ্বিক ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল আইনি ঝুঁকি দূর হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে সিরিয়ার অর্থনীতিতে:
বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম: আন্তর্জাতিক মূলধন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ওপর থাকা চার দশকের বিধিনিষেধ শেষ হওয়ায় বহুজাতিক সংস্থাগুলো এখন পুনর্গঠন প্রকল্পে অংশ নিতে পারবে।
ব্যাংকিং খাতের আধুনিকায়ন: ক্যাশ বা নগদ অর্থনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ও আধুনিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবেশ করছে দেশটির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
ট্যুরিজম ও বাণিজ্যের প্রসার: লেনদেন ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ায় পর্যটন খাত গতি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে সিরিয়ার ব্যাংকিং খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞার আইনি বাধার অবসান ঘটলেও রাতারাতি দেশের অর্থনৈতিক সংকট কেটে যাবে না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক কার্ড চালুর এ উদ্যোগটি মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সূচনা।
সিরিয়ার নতুন সরকারকে এখন আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং (AML) এবং কাউন্টার-টেররিজম ফাইন্যান্সিং (CTF) কাঠামো আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করতে হবে। বিদেশি ব্যাংকগুলো সিরিয়ার সঙ্গে নমনীয় লেনদেন বাড়াতে তখনই ভরসা পাবে, যখন দেশীয় ব্যাংকগুলো বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স নীতি পুরোপুরি অনুসরণ করতে সমর্থ হবে। তবে বর্তমান সার্বিক গতিধারা প্রকাশ করছে যে, সংঘাত ও যুদ্ধের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে সিরিয়া।